চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিক

সিএসএমই খাতে ঋণ বিতরণ কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের অভাব ও খেলাপি ঋণের উল্লম্ফনে দেশের অর্থনীতি স্থবির হয়ে আছে।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের অভাব ও খেলাপি ঋণের উল্লম্ফনে দেশের অর্থনীতি স্থবির হয়ে আছে। অর্থনৈতিক মন্দার সাম্প্রতিক এ সময়ে বাংলাদেশের আর্থিক খাতে বড় আকারের ঋণ বিতরণ খুব একটা দেখা যায়নি। তবে এ ভাটার সময় যেখানে কুটির ও ক্ষুদ্র শিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাওয়ার কথা, সেখানে ঋণ বিতরণ আরো কমেছে। ব্যাংকার, ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকরা দেশের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে এ খাতকে বাঁচানোর আহ্বান জানালেও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প খাতে (সিএমএসএমই) ঋণ বিতরণ কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

সম্প্রতি এসএমই ফাউন্ডেশন আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান দাবি করেন, সিএমএসএমই খাত জাতীয় জিডিপিতে প্রায় ৩০ শতাংশ অবদান রাখছে। পাশাপাশি শিল্প খাতে মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশই এ খাত থেকে আসে। অথচ দেশের অর্থনীতির প্রাণ খ্যাত সিএমএসএমই খাতে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকের ঋণ বিতরণের তথ্যে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ প্রান্তিকে এ খাতে ৩ লাখ ২ হাজার ১৭৫ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৩ হাজার ৯৭০ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে সিএমএসএমই খাতে ঋণ বিতরণ কমেছে ৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ। অবশ্য গত বছরের শেষ প্রান্তিক তথা অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসের ঋণ বিতরণ প্রায় ২৪ শতাংশ কমেছে। সার্বিকভাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে (জুলাই-মার্চ) সিএমএসএমই খাতে ঋণ বিতরণ কমেছে ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ।

সিএমএসএমই খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ঋণ বিতরণ বৃদ্ধির জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বারবারই জোর দেয়া হচ্ছে। এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন নীতিমালা করে দেয়া হলেও উদ্যোক্তারা ঋণ পেতে নানা ধরনের বাধার মুখোমুখি হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসএমই ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন মো. মুসফিকুর রহমান বলেছেন, ‘অর্থায়নের অভাবে বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ এসএমই উদ্যোক্তার প্রকৃত সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যায়নি। দেশের অর্থনীতিতে এসএমই উদ্যোক্তাদের অবদান বাড়াতে এখনো অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এসব বাধা দূর করে অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জন করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে।’

সিএমএসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের মাঝে ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলো অনাগ্রহী বলে অভিযোগ রয়েছে। এ খাতের উদ্যোক্তাদের মাঝে ছোট অংকের ঋণ বিতরণে যে ব্যবস্থাপনাগত জটিলতা এবং সময় ও অর্থ ব্যয় হয়, সে তুলনায় সমপরিমাণ অর্থ বৃহৎ ঋণগ্রহীতাকে দিলে তা ব্যাংকের জন্য বেশি লাভজনক।

দেশের বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর মধ্যে সিএমএসএমই খাতে সবচেয়ে বেশি ঋণ বিতরণ করে ব্র্যাক ব্যাংক। এ বিষয়ে ব্যাংকটির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও এসএমই ব্যাংকিং প্রধান সৈয়দ আবদুল মোমেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনেক কর্মকর্তার মধ্যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণ দেয়ার মানসিকতা দেখা যায় না। এখানে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো ব্যাংকের নিজস্ব আগ্রহ ও উদ্যোগ। আবার প্রতিটি ব্যাংকের কিছু নীতিমালা থাকে, যেগুলোর কারণে তারা সবসময় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহজে ঋণ দিতে পারে না।’ বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুসরণ করে ঋণ বিতরণ করলে সিএমএসএমই খাতের ঋণ আরো বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশ ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রয়াস চালাচ্ছে। উন্নয়নশীল ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো বৃহৎ শিল্পের পাশাপাশি সিএমএসএমই খাতের ওপর জোর দিয়ে এগিয়েছে। তাছাড়া এসএমই খাত বৃহৎ ও ভারী শিল্পের সহযোগী খাত হিসেবেও ভূমিকা পালন করে থাকে। দেশে বিনিয়োগ স্থবির হওয়ায় কর্মসংস্থানে গতিশীলতা নেই। নতুন শিল্প গড়ে না ওঠায় বেকারত্ব ক্রমেই বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্থবির কর্মসংস্থানে গতি ফেরাতে হলে সিএমএসএমই খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ ও বিনিয়োগের বিকল্প নেই। বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হতে পারে সিএমএসএমই খাতের বিকাশ।

আরও